আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে, ছোট একটা স্বিদ্ধান্ত পরবর্তীতে জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলেছে ? হতে পারে রাস্তায় জ্যামে বসে কারো সাথে আলাপ, অথবা ঘুরতে গিয়ে এক্সট্রা একদিন থাকায় নতুন কিছু আবিষ্কার করা।
কেভিন সিস্ট্রম তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে (প্ল্যানের বাইরে) এক্সট্রা একদিন ছুটিতে থাকার সময় ইন্সটাগ্রাম ফিল্টারের আইডিয়া মাথায় আসে। ব্লেক মাইকস্কি অপরিচিত আর্জেন্টাইনদের সাথে কথা বলতে বলতে সেখানকার গ্রামে ঘুরতে যায় , সেখান থেকে তার “TOMS SHOE” এর আইডিয়া আসে। আর লুইস ভন এর ক্ষেত্রে, কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটির ফ্রি লেকচার ; যা তাকে পরবর্তীতে ক্যাপচা, রিক্যাপচা ও ডুয়োলিংগো তৈরিতে পথে নিয়ে যায়।
লুইস ভন অন ১৯৭৮ সালে গুয়াতেমালায় জম্মগ্রহন করেন । তখনকার গুয়াতেমালা দারিদ্রতা আর অপরাধে ঘেরা থাকলেও, বাবা মা ডাক্তার হওয়ায় তিনি ভালো অবস্থানেই ছিলেন। ম্যাথ ছিল তার প্রিয় সাবজেক্ট। সামার ভ্যাকেশনে সব বাচ্চারা সাইকেল, কার্ড নিয়ে খেলত , আর সে উপরের ক্লাসের ম্যাথ বই সলভ করত।
কলেজে পড়ালেখার জন্য তিনি আমেরিকায় চলে আসেন । ম্যাথ প্রফেসর হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও, পরে তিনি কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্স থেকে পিএইডি করেন।
CAPTCHA

২০০০ সালের একদিন তার ক্যাম্পাসে ইয়াহুর ইঞ্জিনিয়ার স্পিচ দিতে আসে। বিষয় ছিলঃ ১০ টি সমস্যা যা ইয়াহু এখনো সমাধান করতে পারছেনা। এর মধ্যে একটি ছিল, কিছু লোক বট (একধরনের প্রোগ্রামিং, যা মানুষের নির্দেশ দেয়া কাজ করত) দিয়ে হাজার হাজার ফ্রি ইমেইল তৈরি করত এবং সেগুলো থেকে স্পাম ম্যাসেজ পাঠাত ।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য লুইস ও তার পিএইচডি এডভাইজর চিন্তা শুরু করেন কিভাবে হিউম্যান আর কম্পিউটার বট ইউজার আলাদা করা যায়। তারা খেয়াল করেন, কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা পড়তে ও লিখতে পারেনা। যদি এমন প্রোগ্রাম তৈরি করা যায়, যেটা ওয়েবসাইটে সেট করলে নতুন একাউন্ট খোলার সময় একটি বক্স ভেসে উঠবে এবং একাউন্ট খোলার জন্য বক্সের উপরে থাকা অক্ষরগুলো লিখতে হবে। তাহলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তারা এই কম্পিউটার প্রোগ্রামের নাম নাম দেন ক্যাপচা (ক্যাপচার থেকে)। এরপর তারা ইয়াহুকে এটা মেইল করে পাঠায়। মাল্টি বিলিয়ন এই কোম্পানির এত বড় সমস্যা সমাধান করে দেয়ার পর লুইস ভন মিলিয়ন ডলার পায় !
না, মোটেও এরকম হয়নি। এমনকি তাদের মধ্যে কোন টাকাই আদান প্রদান হয়নি। ইয়াহু সম্পূর্ণ ফ্রিতেই এই সফটওয়্যারটি পায়।
আস্তে আস্তে অন্যান্য ওয়েবসাইটও ক্যাপচা ব্যাবহার শুরু করে। কয়েবছরের মধ্যে ব্লগের কমেন্ট, ইমেইল খোলা বা টিকেট কেনা, সবখানেই ছিল বিরক্তিকর এই ক্যাপচার উপস্থিতি।
ESP Game

এরপর ২০০৫ সালে তিনি একটি গেইম তৈরি করেন । যেখানে একটি ছবি থাকবে, দুই জন প্লেয়ার যদি ঐ ছবির নাম একই দেয়, তাহলে তারা পয়েন্ট পাবে। যেমন একটি গাছের ছবি ; আপনি এবং অপর গেমার একই উত্তর দিলে আপনারা পয়েন্ট পাবেন।
এই গেমের মূল লক্ষ ছিল ইন্টারনেটে থাকা সব ছবিকে নাম দেয়া, যাতে কম্পিউটার বুঝতে পারে (অনেকটা মেশিন লার্নিং)। পরে গুগল তার থেকে ভালো দামে এটি কিনে নেয়।
মাইক্রোসফটে ইন্টার্ন করে তিনি কার্নেগী মেলন ভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। এক বছর পর
বিল গেটস তাকে কল দিয়ে মাইক্রোসফটে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রায় ৪৫ মিনিট কথা বলার পরেও, প্রফেসর হওয়ার স্বপ্ন ও নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করবেন বলে তিনি বিল গেটসের প্রস্তাব না করে দেন।
re-CAPTCHA

প্রতিবার ক্যাপচা লিখার ফলে ১০ সেকেন্ড সময় অপচয় হয়। আর মানুষও এই ক্যাপচার প্রতি খুবই বিরক্ত ছিল। কিভাবে ক্যাপচাকে আরো ইফেক্টিভ করা যায়, চিন্তা করছিলেন। একই সময় গুগল সব বইকে ডিজিটালাইজ করার ঘোষনা দেয়। ডিজিটালাইজ হলো – বইয়ের ছবি তুলে কম্পিউটারে সাবমিট করা। আর কম্পিউটার প্রোগ্রাম সে ছবির অক্ষরগুলো আইডেন্টিফাই করে লেখাটির কম্পিউটার ভার্সন করে। কিন্তু সমস্যা ছিল কম্পিটার প্রায় ৩০% শব্দ আইডেন্টিফাই করতে পারত না। বিশেষ করে ইটালিক ও পেচানো অক্ষরগুলো।
তাই, লুইস ভন ও তার এক স্টুডেন্ট মিলে বিভিন্ন বইয়ের ছবি তুলে কম্পিউটারে সাবমিট করতেন, এবং কম্পিটারের পড়তে না পারা অক্ষর গুলো ক্যাপচা হিসেবে পাঠাতেন।
আগের ক্যাপচা থেকেও বেটার এই প্রোগ্রাম নিয়ে লুইস বিভিন্ন ওয়েবসাইটকে ফ্রি তে ব্যাবহারের প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে শুধু ভিজিটররা কি লিখে, সে ডাটা এক্সেস চায়।(যাতে সে ডাটা ব্যাবহার করে, কম্পিউটারকে না পারা অক্ষরগুলো শিখাতে পারে)
বড় বড় ওয়েবসাইট গুলোরমধ্যে Onlinebootycall প্রথম এই সার্ভিস ব্যাবহার শুরু করে।
প্রত্যেকবার কেউ যখন কেউ Onlinebootycall এ একাউন্ট খুলতে যায়, তাকে বাঁকা, পেচানো কিছু অক্ষর ক্যাপচায় লিখতে হয়, এবং সে অজান্তেই বই ডিজিটালাইজে সাহায্য করছে।(god bless them)
এরপর ২০০৬-৭ এর দিকে ফেইসবুক তাদের সাইটে এটি ইউজ করা শুরু করলে, নতুন ক্যাপচা ব্যাবহারকারীর সংখ্যা মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। এক সেমিনারে লুইসের নতুন সফটওয়্যার এর কথা শুনে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের পূর্ববর্তী ১০০-১৫০ বছরের সব নিউজপেপার ডিজিটালাইজ করে দিতে করে বলে। প্রতি বছরের নিউজ ডিজিটালাইজ করতে লুইস ভন ৪২০০০ ডলার চার্জ করে। ফেইবুকের মত ফাস্ট গ্রোয়িং সাইট থেকে প্রচুর ক্যাপচা ডাটা আসায়, এক বছরের সব নিউজপেপার তারা মাত্র এক সপ্তাহে ডিজিটালাইজ করে ফেলে।
অথ্যাৎ আপনি যতবার বিরক্তিকর ক্যাপচা সাবমিট করে নিজেকে হিউম্যান প্রমান করেছেন, প্রত্যেকবার আপনি লুইস ভনকে ৪২০০০ ডলার কামাই করতে সাহায্য করেছেন।
একই ক্যাপচা তারা ৫-১০ জনকে পাঠাত। ফলে সহজেই বুঝা যেত, যে আন্সারটা বেশীবার এসেছে, সেটা সঠিক উত্তর। ফলে একুরেসি হাই থাকত ।
ততদিনে এই সফটওয়্যার রিক্যাপচা নামে পরিচিতি পায়। কোন ইনভেস্ট, অফিসরুম ছাড়া সাইড প্রজেক্টে হিসেবে বানানো এই জিনিস থেকে এত ইনকাম অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল।
এরপর গুগল নিজেদের বই ডিজিটালাইজ করতে রিক্যাপচা কিনে নেয়। তাদের ইনফারটেকচারে রিক্যাপচা ইন্টিগ্রেড করার জন্য লুইস ভনের সাথে গুগলের ৩ বছরের কাজের কন্ট্রাক্ট হয়। আর সেখান থেকে ডুয়োলিঙ্গোর আইডিয়া তার মাথায় আসে। রেস্টলেস আর নতুন নতুন বিষয়ে অবসেস লুইস দুইবছরের মাথায়় গুগল থেকে অব্যহতি নেয়।
DUOLINGO

গুয়াতেমালায় দারিদ্রতা, বৈষম্য দেখা লুইস সাধারণের জন্য কিছু করার প্ল্যান শুরু করেন। তিনি খেয়াল করেন, ইংরেজিতে দক্ষরা অন্যান্যদের থেকে জবক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে থাকে। কিন্তু সবার এত টাকা খরচ করে ইংরেজি শিখার ক্ষমতা থাকেনা।
সে অন্য ভাষাভাষীদের জন্য ফ্রি তে ইংরেজি শিখার ওয়েবসাইট চালু করে। আর এই মডেলে সহযোগী হয় তার আরেক ছাত্র সেভরিন হ্যাকার।
এই প্রজেক্টের মডেলও অনেকটা ক্যাপচার মত করেন। যারা ফ্রিতে স্প্যানিশ বা অন্য ভাষা থেকে ইংরেজি শিখবে, শেখার এক পর্যায়ে তাদের স্কিল যাচায়ের জন্য CNN বা NYT এর আর্টিকেল ইংরেজি থেকে নেটিভ ভাষায় ট্রান্সলেট করতে দেয়া হবে। একই আর্টিকেট ৫-১০কে দেয়া হবে। এরপর সবার ট্রান্সলেশন মিলিয়ে ফাইনাল আর্টিকেল বানানো হবে এবং সে আর্টিকেল CNN,NYC এর কাছে বিক্রি করবে।
২০১৩ তে মোবাইল ভার্সন রিলিজের পর, বছর শেষে ডুয়োলিংগো ইউজার ১৫ মিলিয়নে পৌছায় ।
ট্রান্সলেশন সার্ভিস মোবাইল ভার্সনে খুব একটা কাজ না করায়, তারা এটি বাদ দিয়ে দেয়। তাদের মটো ছিল ফ্রি এডুকেশন। কিন্তু ৬০ জন কর্মী নিয়ে এই সার্ভিসে টিকে থাকতে হলে ইনকামের পথ বের করতে হবে। এজন্য ডুয়োলিংগোতে এড দেখানো শুরু করে এবং কেউ এড দেখতে না চাইলে কিছু টাকা পে করে প্রিমিয়াম সার্ভিস কিনে নিতে পারে।
ফ্রিতে ৩৫ টি ভাষা শেখার এই এপে বর্তমানে ৪০ মিলিয়ন একটিভ ইউজার আছে।
ডেইলি নটিফিকেশন, মজাদারভাবে ভাষা শেখানোর কৌশনের কারণে ডুয়োলিংগো ব্যাবহারকারী দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি তাদের ঘরে বসে ইংরেজিতে স্কোর যাচায়ের ব্যাবস্থা (IELTS এর মতো) রয়েছে যেটার সার্টিফিকেট NYU, SU এর মতো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বীকৃতি দেয়। ভাষা শেখার জন্য এত ভালো এপ কমই আছে।
ডিসেম্বর ২০১৯ সালে এই কোম্পানির মূল্য ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌছায় ।

করোনা ভাইরাসের কারণে যখন মানুষ ঘরে বন্দী, এর ব্যাবহারকারীও অবিশ্বাস্যভাবে বাড়ছে।
নিঃসন্দেহে বলা যায় পিটসবার্গের ইউনিভার্সিটির এই প্রফেসর , মিলিয়ন মানুষকে বিরক্ত (ক্যাপচা) করলেও, ভাষা শেখাকে করে তুলেছে সহজ এবং ফ্রি।
আপনি ডুয়োলিংগোতে কোন ভাষা শিখতেছেন ?





